Press "Enter" to skip to content

জিনাত জাহান – (১০ই ডিসেম্বর, ১৯৪০ – ১লা ফেব্রুয়ারী, ২০০২)…

নৃত্য যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় দীর্ঘ দিনের। শুরু থেকে আজ অবধি ঘটেছে এর বিবর্তন। তারই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে অনেক আনকড়া নৃত্য বা নৃত্যধারা। সেই আদিম যুগে মানুষ যখন মনের ভাব বুঝাবার জন্য কোন ভাষা জানতোনা। তখন মানব জাতি তার মনের অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশ করতো অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে। অসংখ্যক দর্শনেত্রীয় নৃত্যকে করে উৎসাহিত মাধ্যম সীমাবদ্ধতা বা অন্যান্য প্রতিকুলতা স্বত্ত্বেও এটি সবার কাছের। আমাদের নৃত্যলোচনায় অনেকের নাম স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায়। জিনাত বরকতউল্লাহ, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা এবং জিনাত জাহান।
১৯৪০ সালের ১০ই ডিসেম্বর জন্মগ্রহন করেন। নৃত্যকে সর্ব সাধারনের করার জন্য তার নিরলস চেষ্টা ছিলো অপরিসীম। বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত নৃত্য শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। যিনি ভারতের এলাহাবাদ সহ বিভিন্ন জায়গায় নাচ পরিবেশন করেছেন। মনিপুরী, ভারতনাট্যম, কথক, ওড়িসি প্রভৃতি নাচ করেছেন তবে তিনি কথক নাচ খুব ভালোবাসতেন। আর এই জন্যই তিনি কথকের উপর জোর দিয়েছিলেন বেশী। কথাকলি নামে আরেকটি নাচ ছিলো যা তিনি কখনোই করতেন না কারন এই নাচটির উপর ধর্মীয়র প্রভাব ছিলো একটু বেশি। জিনাত জাহান নাচ করার পাশাপাশি নাচের একজন শিক্ষীকাও ছিলেন এবং বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর নৃত্যকলা বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। তার অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে বর্তমান নৃত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত শামীম আরা নীপা এবং শিবলী সাদিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জিনাত জাহান নাচের উপর যেমন পারদর্শী ছিলেন ঠিক তেমনি নাচের উপর পেয়েছেন অনেক পুরস্কার এবং সম্মান। তার উল্লেখযোগ্য পুরস্কার গুলির মধ্যে শিল্পকলা একাডেমী থেকে পেয়েছেন ৮টি। তিনি তার জীবনে কখনোই ২য় এবং ৩য় পুরস্কার পারননি। সব সময়ই তিনি প্রথম হয়ে এসেছেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি নাচ শুরু করেছিলেন এব নৃত্যকে আরো প্রতিষ্ঠানিক ভাবে রূপ দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে মুর্ছনা নামে একটি নাচের স্কুল শুরু করেন। সেখান এখানো অনেকে নাচ শিখছেন।
কিন্তু দূঃখের বিষয় এই যিনি সারাটা জীবন নাচের সাথে যুক্ত ছিলেন নাচের উপর এত সম্মান পেয়েছেন আজ সেই মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের মাঝে আর বেঁচে নেই। ২০০২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী শুক্রবার তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছি আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের বিরল এক প্রতিভাকে। তাঁর প্রতি রইল আমাদের হৃদয় ভরা শ্রদ্ধার্ঘ। নৃত্য শিল্পী জিনাত জাহান উপহার দিয়েছিলেন নৃত্য শিল্পের উপর রচিত একটি চমৎকার মূল্যবান গ্রন্থ। তার রচিত গ্রন্থের নামটিও বেশ চমৎকার। নৃত্যকে তিনি নৃতির পোশাক পরিয়ে সৌন্দর্য মন্ডিত করে একটি ব্যতিক্রম ধর্মী শৈল্পিক মনের পরিচয় দিয়েছেন। নৃত্যকলার তত্ত্ব বেশভূষা এবং নৃত্যের সঙ্গে তালের যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে সেইসব কথাও তিনি তার বইটিতে অত্যান্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। যে কোন শিক্ষার্থী এই বইটি পড়ে নৃত্যের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় ভালো ভাবে বুঝতে এবং জানতে পারবেন। শুধু তাই নয় তিনি তার বইটিতে মোহিনী আট্রম, কুচিপুড়ী, ওডিসি বা ত্তড়ীষী নৃত্যও তাঁর বর্ণনা থেকে বাদ পড়েনি। এমনকি এই বইটিতে নৃত্যের বিভিন্ন মুদ্রা শৈলীর স্কেচ ও চিত্র অন্তর্ভূক্ত করার ফলে বইটি শিক্ষার্থীদের কাছে আরো বেশী গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্য এদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ললিতকলা প্রসঙ্গে বহু মূল্যবান গ্রন্থ ও পুস্তক রচিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক নৃত্য সম্পর্কে কোন পূর্ণাঙ্গ বই এযাবৎ প্রকাশিত হয়নি। সেই হিসেবে জিনাত জাহানের প্রাথমিক নৃত্যশিক্ষার বইটি বাংলা সাহিত্যের একটি উপযুক্ত প্রয়াস। জিনাত জাহান যেহেতু একজন নিজে নৃত্য শিক্ষায়ত্রী ছিলেন তাই তিনি অনেক পরিশ্রম ও যত্নের সঙ্গে নৃত্যের সবকিছুই খুব সুন্দর করে উল্লেখ্য করেছেন। যারা শিক্ষানবিশ নৃত্যশিল্পী তাদের কাছে এবং যারা নৃত্যশিল্পী প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন তাদের কাছেও জিনাত জাহান রচিত প্রবেশিকা নৃতি গন্থটি অত্যান্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হবে। এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় একজন নৃত্যশিল্পীকে সামগ্রিক ভাবে গড়ে তোলা এবং উক্ত শিল্পীদের উন্নতির চরম শিখরে তুলে দেয়ার মত গুনাবলী বেগম জিনাত জাহানের মধ্যে ছিলো বিদ্যমান। বলতে গেলে তিনি নৃত্যশিল্পের একজন নিবেদিত প্রান ছিলেন। উচ্চাঙ্গ এবং স্বকীয়তা পূর্ণ শিক্ষা সকলেরই কাম্য। তিনি একজন দক্ষ শিক্ষিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

অলংকরন – মাসরিফ হক…

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: