গানের মধ্যে বেচেঁ থাকবে বঙ্গবন্ধু…

পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালির নিজস্ব একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড-প্রতিষ্ঠার জন্য যে মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাহাত্ম্য বর্ণনা বা প্রশস্তিবন্দনা শিল্প-সাহিত্যের অন্যতম কাজ যেখানে মহামানবই প্রধান, সাধারণের প্রবেশ সামান্য। বাংলা ভাষার শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত এর ব্যতিক্রম নয়। যুগে যুগে বিখ্যাত, বিশিষ্ট, স্মরণীয়, যুগ বা যুগোত্তর প্রতিনিধিদের নিয়ে শিল্প-সাহিত্য রচনার যে ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতা তা সমকালেও বহমান। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যত কবিতা লেখা হয়েছে তার নিকটতম তুলনা দিতে গেলে বঙ্গবন্ধুর নামটিই উল্লেখ করতে হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার অবিসংবাদিত নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি তাঁকে ঘাতকেরা নৃশংসভাবে হত্যা করার পরও বন্দিত হন কবিতা, গান ও ছড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল অন্যান্য মাধ্যমের
কারুকারদের রচিত নানা মাত্রার কাজের মাধ্যমে। এখনো সে ধারা অব্যাহত। তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে দেখি, বঙ্গবন্ধুর নাম কবিতায় প্রথম খোদাই করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘৬৮ সালের মধ্যভাগে তাঁর ‘হুলিয়া’ শীর্ষক সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক কবিতার ভেতর দিয়ে। এর ৮০ ও ৮১তম পঙিক্ততে যেখানে তিনি বলেন : ‘আইউব খান এখন কোথায়? শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?’। ছেপেছিলেন দৈনিক ‘আজাদ’-এর তখনকার সাহিত্য সম্পাদক আ. ন. ম. গোলাম মোস্তফা, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ মুহূর্তে যিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। নির্মলেন্দু গুণ অবশ্য অন্য এক সূত্রে জানিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘৬৪ সালেই কবিতা লিখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম গান রচনা করেন আধুনিক বাংলা গানের এক প্রবাদপ্রতিম গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। অঙ্কুমান রায়ের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’। তাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে আরো অসংখ্য কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম দেখেছেন, যুদ্ধ করেছেন কিংবা কোনো না কোনোভাবে এ সংগ্রামে সংশ্লিষ্ট থেকেছেন কিংবা সমর্থন জানিয়েছেন, দুই বাংলার এমন প্রায় সব কবিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। স্বাধীনতার সপক্ষের বাংলাদেশের সব কবিই তাদের কোনো না কোনো কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন।

আইউব ব্যাটা মুরগি চোর,
ব্যাড়া ভাইঙ্গা দিলো দৌড়।
ধরলো ক্যাডা, ধরলো ক্যাডা?
শেখ মজিবর, শেখ মজিবর ‘।
প্রবল জনরোষের মুখে ‘৬৯ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইউব খান পদত্যাগ করলে দেশব্যাপী বয়ে যায় স্বতস্ফূর্ত আনন্দের বন্যা। জনতার মুখে মুখে তখন এই ছড়া, কোথাও কোথাও পোস্টার ও লিফলেটেও। কেউ জানে না কে তার রচয়িতা। সেই ছড়াতেও বঙ্গবন্ধুর নাম। এরকম সাত চল্লিশ পরবর্তীতে বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের স্লোগান, প্লাকার্ড ও পোস্টারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য স্তুতি ও প্রশংসা দেখা যায়।
মুজিব বাইয়া যাওরে
নির্যাতিত দেশের মাঝে
জনগণের নাওরে মুজিব
বাইয়া যাওরে
ও মুজিবরে, ছলেবলে চব্বিশ বছর রক্ত খাইল চুষি
জাতিরে বাঁচাইতে যাইয়া
মুজিব হইল দূষীরে…

৭০ এর নির্বাচনের সময় গ্রামোফোন রেকর্ডে ধারণ করা হয় এই ঐতিহাসিক গান, যার দৌলতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ঘরে সুরে ও ছন্দে পৌঁছে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। গানটির রচয়িতা, সুরকার ও গায়কের নাম নিয়ে নানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য হলেও এর গানের আবেদন মানুষের কাছে এখনো অবিশ্বরণীয়।
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবিতারই অন্য অঙ্গীভূত শাখা গানের পর গান হয়ে ওঠে আমাদের ন্যায়যুদ্ধ জয়ের, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও প্রেরণাদৃপ্ত করার অপরিমেয় উৎস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল আমাদের সেই উন্মাতাল সময়ের সেইসব গানের সম্প্রচারগত শক্তিশালী হাতিয়ার। এর বেতার তরঙ্গে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গানও আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।…শ্যামল গুপ্তের কথায় এবং বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/ মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর/ সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম…’, এই গান দুটি এখনো যখন শুনি, ঘুরেফিরে আমাদের মন চলে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই উদ্দীপ্ত দিনগুলোতে এবং মনে হয়, বঙ্গবন্ধু এখনো জীবিত, তাঁরই নির্দেশে চলছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এই সময় হাফিজুর রহমানের কথা ও সুরে এবং ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, রথীন্দ্রনাথ রায়, লিলি হক ও শাহীন আকতারসহ লেখক ও সুরকারের নিজের গাওয়া ‘আমার নেতা শেখ মুজিব/ তোমার নেতা শেখ মুজিব’ গানটিও উদ্দীপ্ত করে মুক্তিপাগল দেশবাসীকে। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ মোস্তফা
জামান আব্বাসীর সম্পাদনায় ‘স্বাধীনতা দিনের গান’ শিরোনামী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রচিত ও গীত লোকসঙ্গীতের গানের যে সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয়, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবিদার। জসীমউদ্দীন ১৯৭১ সালের অগ্নিগর্ভ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছেন এই প্রত্যয়দীপ্ত শব্দগুচ্ছে :

মুজিবুর রহমান
ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি উগারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞ্ঝা অশনি যেয়ে।
বাঙলা দেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রসূর্ত রাজ,
প্রতি বাঙালির হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত তাজ।।
জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদসহ বাংলাদেশের কবিরা নানা দৃষ্টিকোণে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। – মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: