প্রাণের খেলায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন…

সঙ্গীত বলতে গীত, বাদ্য ও নৃত্যকে বোঝায়। শুধু এই তিনের সমন্ময়ই নয়, এ তিনের সমবায়ে লোক রঞ্জন করতে পারলেই তাকে সঙ্গীত বলা হয়। সঙ্গীত কলার সাতটি স্বর, তিনটি গ্রাম, একুশটি মুর্ছনা, উনপঞ্চাশটি তান, তিন মাত্রা, তিন স্থান, নবরস ইত্যাদির উল্লেখ আছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে ছয় রাগ ও ছত্রিশটি রাগিনী আছে। এই বিয়াল্লিশটি রাগ-রাগিনীর আবার বহু শাখা-প্রশাখা আছে -যা অগণিত। ছয় রাগ যথাক্রমেঃ (১) ভৈরব, (২) মালব, (৩) হিল্লোল, (৪) সারঙ্গ, (৫) দীপক ও (৬) মেঘ। সঙ্গীতে সাতটি স্বর – স, র, গ, ম, প, ধ, ন। এই সাতটি স্বরকে সপ্তক বলে। তবে সপ্তকের মধ্যে কড়ি ও কোমলস্বর থাকে। যথাঃ স, ঋ, র, জ্ঞ, গ, ম, ক্ষ্ম, প, দ, ধ, ণ, ন । স্বর থেকে ঠাটের উৎপত্তি। সপ্তকের স, প, সহ বাকি র, গ, ম, ধ, ন -এই স্বর গুলির শুদ্ধ ও বিকৃত মিলে কোন সপ্তক রচিত হলে তাকে ‘ঠাট’ বা মেল’ বলে। ঠাট রাগের জনক স্বরূপ। পাটনার ‘রাজা খান’ সর্ব প্রথম সাতটি স্বরের শুদ্ধতা
নির্ণয় করে ‘বিলাবল ঠাট’ আবিষ্কার করেন, পরে বিলাবলকে মান করে আরও নয়টি ঠাট সৃষ্টি করা হয়। পাক-ভারত পমহাদেশের সঙ্গীতে ৭২টি ঠাটের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে ১০টি ঠাট প্রচলিত। ঠাট বা মেল থেকেই রাগের উৎপত্তি। আরোহী, অবরোহী, জাতি, বাদী, সম্বাদী, অঙ্গ ইত্যাদি সহ বর্ণযুক্ত স্বরের এরূপ সুন্দর রচনা যা সর্বদা মানুষের মনে আনন্দ উৎপন্ন করে আসছে-গুণীজনেরা তাকেই ‘রাগ’ নামে অভিহিত করেছেন। বিশুদ্ধ রাগ-রাগিনীকে আশ্রয় করে যে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়, তাকেই রাগ সঙ্গীত বলে। এই প্রকার সঙ্গীত-উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত নামে পরিচিত। ধ্রূপদ, খেয়াল, ঠুমরী, তারানা, টপ্পা, কীর্তন, কাওয়ালি ইত্যাদি সঙ্গীত রাগ-রাগিনীকে আশ্রয় করে পরিবেশন করা হয় বলে, এগুলি রাগ-সঙ্গীত। রাগাশ্রিত বাংলা গানকে বলে ‘রাগ প্রধান বাংলা গান’। সেই রাগ প্রধান গানের আয়োজন করেছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ‘প্রাণের খেলা’ সঙ্গীত-সন্ধ্যা শিরোনামে গত মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ইং তারিখে পরিবেশিত হয় এই রাগ প্রধান গানের অনুষ্ঠান। ঢাকা উনিশ-বিশ শতকে বাংলা গানের সনাতন পদ্ধতি ভেঙে নতুন রীতিতে ভক্তিমূলক গান, রাগসঙ্গীত, রাগপ্রধান গান এবং লঘু সঙ্গীতের মিলিত ধারায় আধুনিক বাংলা গানের নতুন শৈলীর সূচনা করেন রবীন্দ্রধনাথ ঠাকুর। যা স্বকীয় অভিনবত্বে প্রোজ্জ্বল। এবারের ‘প্রাণের খেলা’ অনুষ্ঠানে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গান গেয়ে শোনালেন শিল্পী শামা রহমান এবং মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য।

মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য মায়ের অনুপ্রেয়ণায় গানের চর্চা শুরু ছোটবেলায়। প্রথম গুরু প্রদীপ দাশ। ২০০৯ সালে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলনের প্রতিযোগীতায় সাধারণ বিভাগে ১ম মান অর্জন করেন তিনি। ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনে সাফল্যের সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কোর্স সমাপ্ত করে বর্তমানে ছায়ানটেই শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত আছেন। শিক্ষার্থী অবস্থায় গুণী শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ ঘটেছে, এর মধ্যে সন্জিদা খাতুন, মিতা হক, লাইসা আহমদ উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে অসিত দার কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিচ্ছেন। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও প্রাইভেট চ্যানেল গুলোতে গান পরিবেশন করে থাকেন তিনি। অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশন করেন,
১. সুখহীন নিশিদিন পরাধীন হয়ে।
২. ধীরে ধীরে প্রাণে আমার
৩. হায় গো ব্যথায় কথা যায় ডুবে যায়।
৪. এই তো তোমার প্রেম ওগো।
৫. কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি। – এই গানগুলো।

শামা রহমান এর জন্ম ঢাকায়। ছোটবেলায় ওস্তাদ ফজলুল হকের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনে দুই বছর অধ্যায়ন করেন। পরবর্তীকালে বুলবুল একাডেমীতে আতিকুল ইসলামের কাছে পাঁচ বছর গান শেখেন। তাঁর চৌদ্দটি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবর্ষে ইউনেসকোর উদ্যেগে তাঁর নয়টি এ্যালবাম ২০১১ সালে প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে উন্মোচিত হয়। অনুষ্ঠানে তার গাওয়া গান গুলো ছিল-
১. আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা।
২. ভুবনজোড়া আসনখানি।
৩. অমল ধবল পালে লেগেছে।
৪. দীপ নিবে গেছে মম নিশীথসমীরে।
৫. সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায়
৬. আমার খেলা যখন ছিল।
৭. তবু মনে রেখো যদি দুরে যাই চলে – সহ বেশ কিছু গান পরিবেশন করেন।

যন্ত্রানুষঙ্গে সহযোগে ছিলেন – তবলায় ইফতেখার আলম ডলার, এসরাজে অসিত বিশ্বাস এবং কী-বোর্ডে বিনোদ রায়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। সবার সুস্থ্য সুন্দর জীবন কামনায় সঙ্গীতাঙ্গন। – মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: