Press "Enter" to skip to content

একজন আমজাদ হোসেন...

একটি চলচ্চিত্র, একটি গল্প, একটি কবিতা, একটি গান আপনার আমার আমাদের জীবন থেকেই নেয়া। সেই সুর, সেই গান, সেই চলচ্চিত্রই ধন্য যা মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। আমাদের দেশে অসংখ্য সঙ্গীত আছে যে সঙ্গীতের সুরে কথায় মিশে আছি আমি আপনি আমরা সবাই। ঠিক এমনই একজন সঙ্গীতজ্ঞ আমার আপনার আমাদের জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেই নিজের অনুভূতি ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি, এমনতো প্রেম হয়, দু:খ ভালবেসে, একবার যদি কেউ, কারো আপন হতে, রঙ্গের মানুষ সহ সহ অসংখ্য কালজয়ী জীবনমুখী গান।

বলছি শ্রদ্ধেয় আমজাদ হোসেনের কথা। উনার অনবদ্য সৃষ্টি যেমনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গন তেমনি প্রাণবন্ত করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। সৃজনশীলতার নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন। শিশুসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রের কাহিনীকার, চিত্রনাট্য রচয়িতা, পরিচালক, গীতিকার, অভিনেতা-এরকম নানা পরিচয়ে তিনি পরিচিত। মুখ্য লাভ করেছেন চলচ্চিত্রে। বহুমাত্রিক এই প্রতিভাবান ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট, জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব থেকে লেখালেখির শুরু। ক্লাস থ্রিতে প্রথম ছড়া লেখেন যা প্রকাশিত হয়েছিল টআজাদট পত্রিকায় শিশুদের পাতায়। ১৯৫৬ সালে মেট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কাউকে না জানিয়ে গোপনে কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি কবিতা লিখে পাঠান। কবিতা প্রকাশের আগেই দেশ পত্রিকা থেকে সম্পাদক সাগরময় ঘোষ আমজাদ হোসেনকে একটি চিঠি পাঠান যেখানে লেখা ছিল – ‘কল্যাণীয়েষু, পুনশ্চ. এই যে তুমি কেমন আছ, কী অবস্থায় আছ জানি না। তোমার কবিতা পেয়েছি। তোমার হাতে/কলমে সরস্বতীর আশীর্বাদ আছে। আমার এই পত্র পাওয়া মাত্রই তুমি কলিকাতায় চলিয়া আস। তোমার থাকা-খাওয়া-শিক্ষা সমস্ত কিছুর ভার আমার ওপরে। শুভেচ্ছান্তে সাগরময় ঘোষ।’ কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার কথা কাউকে বলতে পারেননি ভয়ে। লেখা প্রকাশের পর কলেজে হইচই পড়ে যায়। কলেজের এক প্রফেসর আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি সারাজীবন বসুমতি ও ভারতবর্ষে লিখেছি কিন্তু কোনদিন দেশ পত্রিকায় লিখিনি, আমার ছাত্রের কবিতা দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।’ ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চা শুরু করেন। নাটকের কাজের জন্য দুপুরের খাবার বাবদ দৈনিক ২০ টাকা করে পেতেন। সড়ক, সিটি ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন ওয়ান ও বিভিন্ন অফিস পাড়ার জন্য নাটক করতেন, জেলখানার কয়েদিদের জন্যও নাটক করেছিলেন। ঢাকা হলের এক বড় ভাই শওকত আলী বাড়িতে যাবেন তাই শূন্য ঘরটিতে আমজাদ হোসেনকে ক’দিন থাকতে অনুরোধ করলেন। সেই ঘরে বসেই ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখলেন তিনি যার নাম ‘ধারাপাত’। নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর দৈনিক ইত্তেফাকে কভার ফিচার হয় যা নিয়ে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। সৈয়দ শামসুল হকও সাপ্তাহিক চিত্রালিতে ‘ধারাপাত’ নাটকটির প্রশংসা করে ছোট্ট কলাম লেখেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম লোককথা নিয়ে নির্মিত ফোক ছবি ‘রূপবান’-এর পরিচালক সালাউদ্দিন জাকী ‘ধারাপাত’ নাটক দেখে আমজাদ হোসেনকে ডেকে পাঠান। তিনি এই নাটকের গল্প দিয়ে ছবি নির্মাণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অবশেষে সালাহউদ্দিন ‘ধারাপাত’ নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন আমজাদ হোসেন। অবশ্য এর আগে মহিউদ্দিনের ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে আমজাদ হোসেন অভিনয় করে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। এরপর মোস্তাফিজের ‘হারানো সুর’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন, কিন্তু ‘ধারাপাত’ ছবি দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এ ছবির সফলতার পর জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ করা শুরু করেন। সেই সময় চিত্রনাট্যে তাঁর নাম লেখা না থাকলেও জহির রায়হানের অনেক ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন আমজাদ হোসেন।

চলচ্চিত্র পরিচালনা ১৯৬৭ সালে ‘জুলেখা’ ছবিটি পরিচালনার মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আমজাদ হোসেন। ছবি মুক্তির হিসাবে আমজাদ হোসেন হলেন বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির তালিকায় ৩০তম পরিচালক যে তালিকার প্রথম স্থানটি দখল করে আছেন ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালক আব্দুল জব্বার। এরপর জহির রায়হান প্রযোজনায় মোস্তফা মেহমুদ, রহিম নেওয়াজ ও নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে পরিচালনা করেন ‘দুই ভাই’ চলচ্চিত্র।
১৯৬৯ সালে করাচি থেকে ফিরে জহির রায়হান আমজাদ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করেন। আমজাদ হোসেনের গল্প নিয়ে জহির রায়হান নির্মাণ করেন কালজয়ী ঐতিহাসিক ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’ যা আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ঘটনাবলির এক দলিল হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।

স্বাধীনপরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমজাদ হোসেন তাঁদের অন্যতম। তিনি একে একে নির্মাণ করেন – বাল্যবন্ধু, পিতাপুত্র, এই নিয়ে পৃথিবী, নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা, সখিনার যুদ্ধ, ভাত দে, হীরামতি, প্রাণের মানুষ, সুন্দরী বধূ, কাল সকালে, গোলাপী এখন ঢাকায়, গোলাপী এখন বিলেতে নামের দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র।
তাঁর নির্মিত ‘ভাত দে’ ছবিটি এক অসহায় দরিদ্র বাউল শিল্পীর মেয়ে জরির করুণ কাহিনির সফল চিত্ররূপ। এ ছবির স্ক্রিপ্ট টানা একমাস ঢাকা ক্লাবের একটি নির্জন কক্ষে বসে নির্মাণ করেছিলেন। আমজাদ হোসেনের নির্মিত ‘দুই পয়সার আলতা’ ও ‘ভাত দে’ ছবির জন্য কিংবদন্তীতুল্য নায়িকা শাবানা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর ছবিতে চিত্রায়িত হয়েছে গ্রামবাংলার জীবনবাস্তবতা। গ্রামের পটভূমি নিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর জনপ্রিয় ছবি ‘নয়নমণি’। এ ছবির কাহিনীও খুব যত্নে তৈরি করেছেন পরিচালক আমজাদ হোসেন। কাহিনী রচনা ও নির্মাণ নিয়ে শোনা যাক তাঁর মুখেই, ‘অনেক যত্ন নিয়ে সিনেমাগুলো নির্মাণ করেছি। আমরা সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সচেতন ছিলাম। জানতাম, দর্শকের কাছে সে গল্প কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে। দেশ-কালের সে গল্প দর্শক অনায়াসে লুফে নিত।’
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নয়নমণি’ ছবিটিতে ফারুক-ববিতার প্রেম সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। এভাবে প্রতিটি ছবিতে আমজাদ হোসেন দর্শকহূদয় জয় করেছেন, নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য এক উচ্চতায়।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তাঁর লেখক সত্তাও সমানভাবে সক্রিয়। লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, জীবনী, ইতিহাস-সহ বিভিন্ন গ্রন্থ। এর মধ্যে উপন্যাস- ধ্রুপদী এখন ট্রেনে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা, আমি এবং কয়েকটি পোস্টার, রক্তের ডালপালা, ফুল বাতাসী, রাম রহিম; মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস- যুদ্ধে যাবো, উত্তরকাল, যুদ্ধযাত্রার রাত্রি; জীবনীগ্রন্থ – মাওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জীবন ও রাজনীতি; কিশোর উপন্যাস- জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা, ভূতের রাণী হিমানী, সাত ভূতের রাজনীতি; গল্পগ্রন্থ- পরী নামা জোছনায় বৃষ্টি, কৃষ্ণলীলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি ছোটদের জন্য ছড়া ও গল্প লিখেছেন।

আমজাদ হোসেন শুধু একজন কাহিনীকার, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকই নন, তিনি একজন অসাধারণ গীতিকারও। যাঁর লেখা অসংখ্য কালজয়ী হূদয়স্পর্শী গান রয়েছে। যা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আছেনা আমার মোক্তার, হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ, দু:খ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়, তুমি যদি সুখী হও, মন আমার পাগলা ঘোড়া, সময় হয়েছে ফিরে যাওয়ার, ভালোবাসি বলিব না আর, রঙের মানুষ, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিলো না, চুল ধইরো না খোঁপা খুলে যাবে গো, একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, বাবা বলে গেলো আর কোনোদিন গান করো না, এমন তো প্রেম হয়, কত কাঁদলাম কত সাধলাম, চিনেছি তোমারে আকারে প্রকারে, গাছের একটা পাতা ঝরলে কাছের একটা মানুষ মরলে, তিলে তিলে মইরা যামু তবু তোরে ডাকবো না-সহ আরও অনেক গান যা আমাদের চলচ্চিত্রের গানের ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমজাম হোসেনের লেখা গান শুনলেই মনে হয় আমাদের গান, বাংলাদেশের গান। যে গানে কোন বিদেশী গানের ছোঁয়া নাই।

শুধু চলচ্চিত্রই নয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন গুণী নাট্যনির্মাতা ও অভিনেতা হিসেবেও আছে তাঁর সুনাম। ৮০’র দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের নাটক বলতে ছিল আমজাদ হোসেনের লেখা, পরিচালনায় ও অভিনয়ে ‘জব্বার আলী’ নাটকটি। যা সেইসময়ে বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন জব্বার আলী চরিত্রে।

তিনি তার কর্মের মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা সহ পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার; একুশে পদক (১৯৯৩), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৩, ১৯৯৪); বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৪) ও একুশে পদক (১৯৯৩)। উল্লেখ্য, তাঁর পরিচালিত ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ছবিটি ৪ দশক ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের রেকর্ড ধরে রেখেছিল। এরপর ‘ভাত দে’ ছবিটি ৯টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী হয়।
আমজাদ হোসেনের সৃষ্টি কখনো ভোলার মতো নয়।
গত কয়েক দিন ধরেই আমাদের এই প্রাণের মানুষ আমজাদ হোসেন অসুস্থ।

বাবার অসুস্থতা নিয়ে আমজাদ হোসেন এর সুযোগ্য সন্তান দেশের জনপ্রিয় গীতিকবি এবং নির্মাতা সোহেল আরমান লিখেন –

আমজাদ হোসেন
যে মানুষটি এ দেশের গণমানুষের কথা বলতেন। অবক্ষয়ের কথা বলতেন। বিশেষ করে যারা নিপীড়িত। অনাহারী। অবহেলিত। তাদের কথা বলতেন।
যে মানুষটি শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলতেন। গ্রামের সহজ সরল মানুষদের হয়ে প্রতিবাদ করতেন যখন তারা শোষিত হতেন।
যে মানুষটির সংলাপ একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে জীবন থেকে নেয়াতে দেশের পক্ষে যুদ্ধ করে।
যে মানুষটির কলম এ বাংলার সাহিত্যকে গর্বিত করে।
যে মানুষটির লেখা গান কোটি কোটি মানুষের ঘরে। এখনো কোনো যুবক গেয়ে ওঠে জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো…..
যে মানুষটির চলচ্চিত্র বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে, একটি আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র হয়ে আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে নিয়ে আসে।
যে মানুষটিকে নিয়ে বলে শেষ করা যায় না। এ যেন অফুরন্ত ট্রেন লাইন, এক গোলাপীকে নিয়ে উঠে গেছেন তিনি।
বাবা …. আমি আর লিখতে পারছিনা। তোমার এত এত সৃষ্টি এ যেন এক বিশ্ববিদ্যালয়।
আজ সেই মানুষটি মস্তিষ্কের রক্ত প্রবাহে বাধাজনিত কারণে ৬দিন ধরে হাসপাতালে আই সি ইউ তে লাইফ সাপোর্টে জীবন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছেন। আপনারা সবাই দোয়া করবেন। আল্লাহতালা যেন তাকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।
ফিরে এসো বাবা…….।”

আমরাও চাই আপনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন।
আবার কলম ধরে লিখুন-
“এমনও তো প্রেম হয়
চোখের জলে কথা কয়।”
– মোহাম্মদ আমিন আলিফ

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: