Press "Enter" to skip to content

মোহাম্মদ নূর রঞ্জন ‘উইনিং’ থেকে নাশিদ শিল্পী…

– সালমা আক্তার।
অনুভবের কথা বলে সুরের সাধনা, সুর যখন অন্তর ছুঁয়ে যায় তখন তা হয়ে উঠে সুরের আরাধনায়, কন্ঠের ভাষা, অনুভূতির আওয়াজ। মোহাম্মদ নূর রঞ্জন এমনি এক সুরের সাধক, যার অন্তর সব সময় অনুভূতির ভাষা খুঁজে ফিরে অনুসন্ধানী চোখে। কন্ঠ সাধনায় তিনি বেছে নিয়েছেন কাপেলা।

কাপেলা – ‘কণ্ঠ সঙ্গীত’ সম্পর্কে মোহাম্মদ নূর রঞ্জন বলেন ঐতিহ্যগতভাবে সব ধরণের সঙ্গীতই, একটা প্রচলিত ধারায় কম্পোজ করা হয়ে থাকে, সেটা উপমহাদেশীয় সঙ্গীত হোক, কিংবা প্রাশ্চাত্য সঙ্গীত হোক, যে কোন ধরণের সঙ্গীতই হোক না কেন, সেটা রচনা করা থেকে শুরু করে রেকর্ডিং করা পর্যন্ত, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, একটা বিশাল ভূমিকা রাখে। সৃজনশীলতা বা ধারণা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কোনও সীমা রেখা নেই, অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। আর প্রযুক্তি তো রয়েছে !

অন্য দিকে কাপেলা সঙ্গীতে বাদ্যযন্ত্রর কোন রকমের ব্যবহার থাকে না বরং অনেক সীমাব্ধতা থাকে, পূরো সঙ্গীতটাই রচনা করা হয় কণ্ঠ দিয়ে, মূল গায়ক বা লিড ভোকালিস্ট এর পাশাপাশি আরও যারা গান রচনার ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করে থাকেন, তারাও ভোকালিস্ট। গানের কম্পোজিশনে, তাদের একটা বিশাল ভুমিকা থাকে, তাদের কাজ হচ্ছে, কণ্ঠ দিয়ে ‘সাউন্ড ট্র্যক’ সৃষ্টি করা, এক কথায় বলা যায় তারা ব্যাক আপ সঙ্গীত (back up musician। তাদের মধ্যে কেউ কণ্ঠ দিয়ে কি বোর্ড, কেউ বা গিটার আর
কেউ বা ড্রামসের শব্দ পরিবেশন করছেন। মজার কথা হচ্ছে, পুরো গানটাই সৃষ্ট হচ্ছে কণ্ঠ দিয়ে। আর এজন্যই এটাকে বলা হয় Capella অথবা ‘কণ্ঠ সঙ্গীত’। কন্ঠকে বাদ্যযন্ত্ররূপে বহ্নিশিখারূপে প্রকাশ মূলত সুপ্ত প্রতিভার
এক বিস্ময়কর চিত্র, যে চিত্রের দৃশ্যপট অদৃশ্য শক্তি তার আবেগের, আবেদনের খেলা খেলে যায়।
মোহাম্মদ নূর রঞ্জনের নাশিদের বিশেষ দিক গুলো : পদার্পণের শুরুটা হয়েছে ব্যন্ড সঙ্গীতে, চিন্তা চেতনায় আজ অবধি প্রথম এবং শেষ ব্যান্ড ‘উইনিং’, ভেতরে ভেতরে সবসময় ‘ব্যান্ড’ মন মানসিকতা কাজ করে, সুরের খেলার বৈচিত্র্যময়তা মুগ্ধ করে সব সময় ভেতরের চিন্তাকে, অন্তর্দৃষ্টিতে ব্যান্ড এর সার্থকতাই ছিল নিজের সার্থকতা, সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করেছে ‘উইনিং’, উইনিং এর সফলতাই ছিল নিজের সফলতা। আর তাই আজ, যখন প্রথম বারের মত একজন সোলো পারফর্মার হয়ে, বিশেষ করে একজন একক নাশিদ কাপেলা শিল্পী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করি, তখনও মনের মধ্যে ‘ব্যান্ড’ এর মন মানসিকতাটাই কাজ করে। যখন লিখি বা সুর চেষ্টারত হয় অন্তর, তখন ব্যান্ড সঙ্গীত ডাইনামিক্স অথবা ব্যান্ড গতিবিদ্যা বিষয়টি কাজ করে ।

মোহাম্মদ নূর রঞ্জনের নাশিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন :
আমি মূলত একজন ‘কাপেলা সঙ্গীত শিল্পী’ এবং অধিকাংশ গানই ‘নাশিদ’, অর্থাৎ – ইসলামিক গান, সব ‘নাশীদ’ বা ‘কণ্ঠ সঙ্গীত’ দিয়ে সৃষ্টি করা, এখানে সঙ্গীতে কোন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নেই, বাদযন্ত্রের বিকল্প হিসাবে ‘কণ্ঠ’কে ব্যবহার করেছি অর্থাৎ, গানের পেছনে যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক থাকছে, সেটা ১০০% কন্ঠ দিয়ে সৃষ্টি করা ।

১। গতানুগতিক ইসলামিক গানের থেকে ভিন্ন :
আমার লেখা ও সুরের মধ্যে আধুনিকতা আছে, প্রাশ্চাত্য সঙ্গীতের কিছুটা প্রভাব আছে, এ কারণেই ছোট বেলা থেকেই আমি প্রাশ্চাত্য সঙ্গীত শুনে এসেছি, ভেতরের চাওয়া সুরের টানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা, যে টান সংগীত প্রয়াসীর কাছেই বোধগম্য হয়। গানের কথা ও সুরের মূর্ছনায় হারানো মন খুঁজে ফিরি প্রকৃতির সৌন্দর্যে আর রূপরেখার চিত্রে।

২। ধির লয় ও মন্থর গতি থেকে একটু ভিন্ন ধাচের : সপ্তস্বরের খেলায় যেহেতু ড্রামার হয়ে আমার ব্যান্ড সংগীতে আসা, সেহেতু নতুন কোন নাশীদে কাজ করতে গেলেই প্রথমে যে জিনিসটা আমার ভেতরে কাজ করে, সেটা হচ্ছে – ছন্দ বা ‘Groove’। সে জন্য আমার নাশিদ গুলোতে যথেষ্ট ছন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে এবং সেটাও কণ্ঠ দিয়ে ! আমার নাশিদে ‘Percussion’ গুলোও নিজের কণ্ঠে করা, যার কারণে নাশিদকে নিজের মত করে সাজাতে পারি ।

৩। কোন ধরনের বাদ্য যন্ত্র ব্যবহার নেই :
ব্যান্ড মিউজিক থেকে বেরিয়ে এসে, একেবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাচের সঙ্গীত, তাও আবার ধর্মীয় এবং বাদ্য যন্ত্র ছাড়া – এই বিষয়টা আমাকে বিগত বছর গুলোতে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে।
‘আযান’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ নাশিদ দুটো করার পর, আমার নিজের প্রতি আস্থা অনেক খানি বেড়ে গেছে । বিশেষ করে ‘ব্যকগ্রাউন্ড’ মিউজিক, তাও কিনা আবার কণ্ঠ দিয়ে কম্পোজিশন হবে, সেটা নিয়ে ভীষণ দন্দ্বে ছিলাম। আমার নাশিদের কোন ধরনের বাদ্য যন্ত্র ব্যবহার হবে না । ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক থাকবে, এবং সেটাও কণ্ঠ দিয়েই ! এই আত্মবিশ্বাস আনতে অনেক সময় লেগেছে।

৪। শুধু আল্লহ ও রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে নয়, বরং ধর্মীয় আরও অন্য বিষয় আমার নাশিদে থাকছে :
নিউজিল্যান্ড হামলাকারীর গুলিতে মসজিদে নিহত মুসলিমদের উৎসর্গ করে আমার ৩য় নাশীদ – MARTYRS রিলিজ হয় । সেটা ছিল ইংরেজি ভাষায়।

৫। সুর এবং কথা সবগুলোই আমার :
নিজের কথা এবং নিজের সুর হওয়াতে, নিজের ইচ্ছে মত, নাশিদকে যেভাবে ইচ্ছে আমি সাজাতে পারি। আরেকটা পরিতৃপ্তি হলো আমার কথা ও সুর গুলোকে আমি ব্যান্ডের আঙ্গিকে চিন্তা করি। যার কারণে, কথা ও সুর গুলোকে চেষ্টা করি খুব সহজ ও সরল রাখতে। ৭০ / ৮০ দশকের ব্যান্ড সঙ্গীতের মূল ধারা ছিল সরলতা। প্রযুক্তির দৌরাত্ম্য না থাকার কারণে আমাদের ব্যান্ড সঙ্গীত ছিল খুব সাদা মাটা। আমি যেহেতু সেকালের সঙ্গীত শিল্পী, তাই আমার নাশিদের কথার শুরু সাদা মাটা। এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে চাই শেষ নিঃশ্বাস অবধি, শুধু দর্শকদের ভালোলাগা ও ভালোবাসা প্রার্থনা করি সর্বদা। ভালো কিছু করে যেতে চাই, প্রচেষ্টা থাকবে অবিরত।

৬। কম্পোজিসন, এরেঞ্জমেন্ট সম্পর্কে তিনি বলেন :
আমার বন্ধু, সোমালিয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান একজন কম্পোজার, মিক্সিংয়ের কাজ আমরা দুজন মিলেই করি, প্রতিটা নাশিদের কাজ শুধু মাত্র আমরা দুজনে মিলেই করি, আমাদের কাজের ধারাবাহিকতা খুব প্রাণবন্ত রাখতে চেষ্টা করি, কাজের সৃষ্টি প্রকৃতিও একই রকম সারা দেয়। উভয়ের কাজের মন মানসিকাতার মধ্যে যথেষ্ট মিল থাকার কারণে আমাদের নাশিদে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুব একটা বেগ পেতে হয় না, প্রত্যেকটা নাশিদ মাস্টারিং করা হয়েছে টরেন্টোর এর অন্যতম মাস্টারিং স্টুডিও ‘Phase One Studios’ এ।

মোহাম্মদ নূর রঞ্জনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেন :
আমার প্রচন্ড ইচ্ছে বাংলাদেশে এই ধরণের ‘কাপেলা’ সঙ্গীত এবং ‘নাশীদ’ গানের শ্রোতা প্রবর্তন করা এবং পাশাপাশি সংস্কৃতিকে ভালোবেসে সংস্কৃতির চর্চা করা। নাশিদকে কাপেলার মধ্যে দিয়ে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলার গভীর স্বপ্ন ভেতরে কাজ করে, একই সাথে, কাপেলা সঙ্গীত শিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করার প্রয়াস রয়েছে। ‘আমিন প্রোডাকশন’, ‘কাপেলা সঙ্গী’ এবং ‘নাশীদ’ গানের প্রতিভা তৈরিতে আগ্রহী ভূমিকা পালন করছে, আমীন প্রোডাকশনের ‘নাশীদ’ কাপেলা সঙ্গীত শিল্পী অনুসন্ধানে ভূমিকা রাখার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করি ভেতর থেকে সব সময়।

ইনশাল্লাহ আসছে ঈদে থাকছে ৪র্থ নাশীদ ‘ঈদ মোবারক’, আমিন প্রোডাকশনের ব্যনারে, এছাড়া আগামী পরিকল্পনায় আরও থাকছে আমিন প্রোডাকশনের ব্যানারে প্রথম সোলো এ্যালবাম।
টরেন্টোতে প্রথম সোলো নাশিদ কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে ২০২০ইং সালে জুলাই মাসে।
২০২০ইং সালে ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় একটি সোলো নাশিদ অনুষ্ঠিত হবার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাক নাশিদ, কন্ঠের স্রোত ধারার গতি বেগে, অন্তরের ভালোবাসা নাশিদ, ভালোলাগা বলতে শ্রোতাদের মন জয় করাকে বুঝি, আনন্দ বিলিয়ে দেয়া, কন্ঠের সাধনায় আকাঙ্ক্ষা এইটুকু, হাজার কর্মের মাঝে একটা কর্ম এমন হোক যে কর্মের মৃত্যু নেই। পথ চলা ভক্তদের মনোরঞ্জনের জন্য, এই পথ চলা সংগীত পিয়াসি মনের ভালোবাসার তাগিদে, শিহরিত মন প্রাণ দিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি আগামী সুরেলা ভোরের জন্য, তারুণ্যময় অনুরাগের জন্য, অন্তহীন প্রচেষ্টা হোক আমার এই পথ চলায়।

More from সুরের ভূবনMore posts in সুরের ভূবন »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *