Press "Enter" to skip to content

একাই তিন দেশের জাতীয় সঙ্গীতের জনক…

– মোশারফ হোসেন মুন্না।
পৃথিবীর সকল দেশেরই জাতীয় সঙ্গীত আছে। আছে পতাকা। দেশের মাটিতে যখন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় তখন এক রকম অনুভূতি আর যখন তা বিদেশে কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়া হয় তখন অন্যরকম আবেগের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। জাতীয় সঙ্গীতে দেশ বন্দনা করা হয়। আবার কোনো কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীতে রাজা-রানীর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করা হয়। প্রতিটি দেশেরই জাতীয় সঙ্গীত রচনা বা নির্ণয়ের প্রেক্ষাপট রয়েছে।
আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর যখন পাকিস্তান সরকার বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করছিল তখনই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্ততি। ছাত্রলীগের নেতারা ১৯৭১-এর ২ মার্চ বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ক্যান্টিনে বসে জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের ব্যাপারে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন তা জানানো হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের মধ্যে থেকে প্রথমে প্রস্তাব ওঠে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত করার।
আলোচনায় এরপর উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত গানটিতে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি নেই। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ রচিত গানটিতে ‘বাংলা’ শব্দটি আছে তাই সেটিই সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্ধারণ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধুও তাতে সম্মতি প্রদান করেন।
১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকুঞ্জে (পরে মুজিবনগর) অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে। ১৯৭২-এর সংবিধানে গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন বা স্বদেশী আন্দোলনের সময় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে গগন হরকরার গাওয়া ‘আমি কোথায় পাব তারে, মনের মানুষ যে রে’ গানটি অনেকটা অনুসরণ করে বাউল সুরে রবীন্দ্রনাথ গানটি রচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতীয় সঙ্গীতেরও প্রণেতা। ১৯১১-এর ২৭ ডিসেম্বর তিনি ভারতের জাতীয় সঙ্গীত রচনা এবং তাতে সুরারোপ করেন। গানটি ১৯৩৭-এর ৫ জুলাই সুভাষচন্দ্র বসুর উপস্থিতিতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবেই গাওয়া হয়। সুভাষচন্দ্র বসুই গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। ১৯৫০-এর ২৪ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গানটি স্বীকৃতি লাভ করে ভারতের জাতীয় সংসদে। তবে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্রাক্কালে ভারত সরকারের কাছে জাতিসংঘ থেকে জাতীয় সঙ্গীত চাওয়া হয়, ভারত সরকার এই গানটির স্বরলিপি পাঠায়। শুরু থেকেই গানটির প্রথম পর্ব জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়।
জনগণমন- অধিনায়ক হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ
বিন্ধ্যা হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ
তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিষ মাগে,
গাহে তব জয়গাঁথা।
জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে।
বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানটি সমমর্যাদায় জাতীয় সঙ্গীতের স্বীকৃতি পায়। তবে এটি ভারতের রাষ্ট্রগীত হিসেবে বিবেচিত হয়।

শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ গানটি তার শ্রীলঙ্কান ছাত্র আনন্দ সামারাকুনের জন্য রচনা করেন। সামারাকুন ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে সিংহলী ভাষায় গানটি অনুবাদ করেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫০ পর্যন্ত ব্রিটিশ জাতীয় সঙ্গীতই শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হতো। সে বছর শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী জে আর জয়বর্ধনের প্রস্তাবে রবীন্দ্রনাথ রচিত গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আমার শ্রীলঙ্কা নমো নমো নমো নমো মাতা.
সুন্দর শ্রীবরণী
সুন্দরী শ্রেষ্ঠ লঙ্কা
ধন ধান্যে ভরা জননী,
তুমি সকলের সেরা বিশ্ব জয়া
সেরা ভূমি যথা,
আমাদের রেখেছ সযতনে
ওহে প্রিয় দেশ মাতা!
তোমারই প্রতি মোদের ভক্তি পূজা
নমো নমো নমো।
এটাই তাদের দেশের সঙ্গীত। যাকে তারা খুব শ্রদ্ধা ও সম্মান করে।
আমরা সকল দেশের জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। সাথে শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় সঙ্গীতের জনককে। বিশেষ করে কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। দেশ ও দেশের মানুষ সকলের প্রতি রইলো ভালোবাসা। সঙ্গীতাঙ্গন এর সাথে থাকুন। বাংলা সঙ্গীতকে ভালোবাসুন।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *