Press "Enter" to skip to content

বিশ্ব সেরা দামি দশ গিটার…

– মোশারফ হোসেন মুন্না।
সদ্যই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছেন বাংলাদেশের গিটার কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। শুধু গায়ক না, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন গিটারের এক জাদুকর। ছিলেন গিটার সংগ্রাহক এক মানুষ। তার শূন্যতার পর প্রশ্ন উঠেছে তার গিটার নিয়ে? কী হবে সেইসব রুপালী গিটারের? কোথায় হবে তাদের নতুন ঠিকানা? এমন প্রশ্ন নতুন নয় মোটেই। যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে নিলামে কিংবা চ্যারিটিতে বারবার উঠেছে বিভিন্ন নামিদামি গিটার। হয়তো আইয়ুব বাচ্চুর গিটারও চলে যাবে নতুন কোনো ভক্তের হাতে। তবে তার আগে চলুন জেনে নিই, এ যাবত বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামি দশ গিটার সম্পর্কে।

১০। এরিক ক্ল্যাপটনের – মারটিন ১৯৩৯ ০০০-৪২ এ্যাকোষ্টিক (Martin 1939 000-42 Acoustic) –

তালিকার বাকি সব গিটারের তুলনায় এটি একদম আলাদা। অন্যান্য সব লিড গিটারের ভিড়ে এটি একমাত্র একোস্টিক গিটার যার স্থান হয়েছে এই তালিকায়। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলানো হলে বলা যায় এটিই বিশ্বের সবচেয়ে দামি একোস্টিক গিটার। এরিক ক্লিপটন এই মার্টিন গিটার বাজিয়েছিলেন তার বিখ্যাত ১৯৯২ সালের এমটিভি আনপ্লাগড সেশনে।
একসময় সাধারণের বেশ নাগালের বাইরে ছিল মার্টিন সিরিজের যেকোনো গিটার। কিন্তু এরিক ক্লিপটনসহ আরো কিছু কিংবদন্তী গিটারিস্ট আর অনবদ্য কিছু রেকর্ডিং এর কল্যাণে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে এইসব গিটার। ২০০৪ সালে মারটিন ১৯৩৯ ০০০-৪২ এ্যাকোষ্টিক গিটারটি বিক্রি হয় ৭৯১,৫০০ ইউএস ডলারে।

৯। এরিক ক্ল্যাপটনের – গিবসন ১৯৬৪ ইএস৩৩৫ টিডিসি (Gibson 1964 ES335 TDC) –

তালিকায় নবম স্থানেও আছে এরিক ক্লিপটনের ব্যবহার করা গিটার। তবে এই লিড গিটার যা বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি গিবসনের। যুগে যুগে নানান নামকরা গিটারিস্টের হাতে শোভা পেয়েছিল গিবসনের গিটার। ক্ল্যাপটন প্রথমে এই গিটারটি ব্যবহার করেন তার ব্যান্ড ‘ইয়ার্ডবার্ড’ নিয়ে যখন তার স্বত্তাধিকার নিয়ে ঝামেলা চলছিল ঠিক সেই সময়ে। পরবর্তীতে ‘ক্রিম’ ব্যান্ডে কাজ করার সময় একাধিকবার তিনি এই গিটারের সুরে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন।
১৯৬৮ সালের নভেম্বরে ক্রিম ব্যান্ডের সর্বশেষ শো’তে এরিক ক্ল্যাপটন গিবসনের এই গিটার হাতেই স্টেজে উঠেছিলেন। তার মার্টিন গিটারের মতো এটিও ২০০৪ সালে নিলামে তোলা হয় এবং এর সর্বোচ্চ দাম এসেছিলো ৮ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫০০ ইউএস ডলার।

৮। জেরি গার্সিয়ার – টাইগার (Tiger) –

জেরি গার্সিয়ার ক্যারিয়ারের সবচে স্বর্ণালী সময়ের সাক্ষী কাস্টমাইজ ডিজাইনের গিটার টাইগার। গিটারের এক প্রান্তে একটি বাঘের ছবি থেকেই মূলত গিটারের নাম হয় টাইগার। ১৯৯৫ সালে রিহ্যাব ক্লিনিকে নিজের জন্মদিনের মাত্র আট দিন পর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় জেরি গার্সিয়াকে।
টাইগারের পরপরই ‘রোজবাড’ নামের একটি গিটার নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন গার্সিয়া। কিন্তু রোজবাড বেশিদিন টিকতে পারেনি। সেই হিসেবে ‘টাইগার’ ছিল জনসম্মুখে জেরি গার্সিয়ার বাজানো শেষ গিটার।
২০০২ সালে ৯ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫০০ ইউএস ডলারে বিক্রি হয় জেরি গার্সিয়ার স্মৃতি বিজারিত গিটার টাইগার।

৭। এরিক ক্ল্যাপটনের – ব্ল্যাকি (Blackie) –

এরিক ক্ল্যাপটনের সম্পর্কে ছোট্ট একটি তথ্য জানিয়ে রাখা উচিত। ক্ল্যাপটন একমাত্র ব্যক্তি যিনি তিনবার ‘রক এন রোল হল অফ ফেম’ তালিকায় নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছেন। একবার স্বতন্ত্র ও বাকি দুবার তার ব্যান্ড ‘ইয়ার্ডবার্ড’ এবং ‘ক্রিম’ ব্যান্ডের হয়ে।
মোট ছয়টি গিটার কিনেছিলেন ক্ল্যাপটন। এরমাঝে ৩ টি তিনি উপহার দিয়েছিলেন পিট টাউনশেন্ড, জর্জ হ্যারিসন ও স্টিভ উইনউডকে। এরপর বাকি তিনটি গিটারের সমন্বয়ে নিজেই গড়ে নিয়েছিলেন গিটার ‘ব্ল্যাকি।’
ক্ল্যাপটনের সবচে বেশি ব্যবহার হওয়া গিটার সম্ভবত ব্ল্যাকি। ১৯৮৫ সালে ছেড়ে দেয়ার আগে অসংখ্য কিংবদন্তী সুরের জন্ম হয়েছে ব্ল্যাকির ছয়টি তারে। ২০০৪ সালেই নিজের পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘ক্রসরোড’ এর জন্য আয়োজিত এক নিলামে তোলা হয় এই গিটারটি। গিটারটি বিক্রি হয়েছিল ৯,৫৯,০০০ ইউএস ডলারে।

৬। বব ডিলানের – ১৯৬৪ ফেন্ডার স্ট্র্যাটোকাসটার (1964 Fender Stratocaster) –

বব ডিলান! সেই কিংবদন্তী গায়ক। আর তার সেই ১৯৬৪ সালের ফেন্ডার গিটার। লেস পল, গিবসনের মতো ফেন্ডার গিটারও যুগে যুগে অনেক কিংবদন্তী গিটারিস্টের সেরা সঙ্গী হয়েছিল। ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল জয় করা বব ডিলান এই গিটারটি প্রথম বাজিয়েছিলেন ১৯৬৫ সালের একটি ফোক গানের উৎসবে। ১৯৬৫ সালেই বব ডিলান প্রথমবারের মত নিজের ফোক সঙ্গীতে ইলেক্ট্রনিক গিটারের ব্যবহার শুরু করেন।
গিটারটি নিলামে তোলা অবস্থায় এটি বেশ নতুন ছিল। কারণ মাত্র এক বছরের মাথায় নিলামে চলে যায় গিটারটি। ফেন্ডারটি বিক্রি হয় ৯ লক্ষ ৬৫ হাজার ডলারে।

৫। কিথ রিচার্ডস এর – ১৯৫৯ লে পল স্ট্যান্ডার্ড (1959 Les Paul Standard) –

ইলেকট্রনিক গিটারের, আঝে ‘হলি গ্রেইল’ বলা চলে ১৯৫৯ সালের লেস পল স্ট্যান্ডার্ড গিটারকে। বর্তমানে এর খুব বেশি দেখা পাওয়া যায় না। বলতে গেলে এরকম দুষ্প্রাপ্য বলা চলে। লেস পল বলতে গেলে প্রায় সব বিখ্যাত গিটারিস্টের হাতেই শোভা পেয়েছিল। এই তালিকার সেরা পাঁচে তাই ১৯৫৯ লেস পল স্ট্যান্ডার্ডের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে মোট দু”বার।
তালিকার পাঁচ নাম্বারে থাকা এই গিটারের মালিক রোলিং স্টোন ব্যান্ডের কিথ রিচার্ডস। এই গিটারের মাধ্যমেই রোলিং স্টোনের অভিষেক ঘটে। যা ছিল রক এন্ড রোল ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০০৩ সালের এক নিলামে এই গিটারের দাম ছিল ১ মিলিয়ন ইউএস ডলার।
ছয় অঙ্কের গিটারের ভূবনে আপনাকে স্বাগতম।

৪। বব মার্লের – ওয়াসবার্ন ২২- সিরিজ হক (Washburn 22-series Hawk) –

কিংবদন্তী হিসেবে সঙ্গীত ভুবনে আজীবন তার নাম লেখা থাকবে। বব মার্লে মানেই অনবদ্য সব গিটার সুর আর মন ছোঁয়া লিরিক্স। পুরো জীবনে তার গিটারের সংখ্যা ছিল মাত্র সাত। তারই একটি এই ওয়াশবার্ন ২২ সিরিজের ‘হক’ গিটারটি। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল বব মার্লে এই গিটারটি পরে অন্য একজনকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। উপহারই বটে!
বব মার্লে এই গিটার দিয়েছিলেন তার গিটারের টেকনেশিয়ান গ্যারি ক্লসেনকে। যা হোক, পরবর্তীতে জ্যামাইকা সরকার গিটারটিকে জাতীয় সম্পত্তি ঘোষণা দিয়ে এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। শোনা যায়, এর জন্য জ্যামাইকা সরকারকে ১.২ মিলিয়ন থেকে ২ মিলিয়নের মাঝামাঝি দাম পরিশোধ করতে হয়েছে।

৩। জেরি গার্সিয়ার – ওলফ (Wolf)

বাঘের পর এবার চিতার পালা। এবারো গিটারের মালিক জেরি গার্সিয়া। গিটারের নাম ‘ওলফ’ হবার পিছনে এর গায়ের অসাধারণ ডিজাইনকেই দেখা হয়। জেরি গার্সিয়ার দুটি আইকনিক গিটার ‘টাইগার’ ও ‘ওলফ’ একই সাথে একই নিলামে উঠেছিল। ২০০২ সালের সেই নিলামে কিন্তু দামি গিটার ছিল ‘টাইগার’। ২০০২ সালে ৭ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫০০ ইউএস ডলারে বিক্রি হওয়া ‘ওলফ’ দ্বিতীয়বার নিলামে ওঠে গতবছর। এবার সেই গিটার এক লাফে চলে আসে সবচে’ দামি গিটারের তালিকার তিন নাম্বারে। জেরি গার্সিয়ার এই গিটারের হাতবদল মূল্য ছিল ১.৯ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

২। জিমি হেনড্রিক্স এর – ১৯৬৮ ফেন্ডার স্ট্র্যাটোকাসটার (1968 Fender Stratocaster)

এ পর্যায়ে একটু আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি স্মৃতিচারণ করা যাক। এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার নিজের গিটারের আইডল কে ? উত্তরে বাচ্চু বলেছেন, তার জন্য গিটারের এক থেকে দশ সবই জিমি হেনড্রিক্স। সেই জিমি হেনড্রিক্সের ফেন্ডার গিটার আছে এই তালিকার দুই নাম্বারে। তবে এখানে বলে রাখা ভাল, এটি যৌথভাবে ২য় স্থান দাবি করতে পারে।
মাইক্রোসফটের যৌথ প্রতিষ্ঠাতা পল এ্যালানের মালিকানায় থাকা এই গিটারের দাম প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার। জিমি হেন্ড্রিক্স খুব বেশি ব্যবহার না করলেও অসাধারন ডিজাইন ও এর কিছু স্মৃতির কল্যাণে এর দাম চলে যায় ২ মিলিয়নের ঘরে।

২। পিটার গ্রিন এবং গ্যারি মুরের – ১৯৫৯ লে পল (1959 Les Paul)

যদি মূল্য বাদ দিয়ে ইতিহাসের কথা ভাবা হয় তবে তালিকার সবচেয়ে কাঙ্খিত ও দামি গিটার অবশ্যই এই গিটারটি। এই গিটারের প্রথম মালিকানা ছিল পিটার গ্রিনের। পরবর্তীতে এটি ব্যবহার করেন আরেক কিংবদন্তী গ্যারি মুর। কিন্তু এরপরের তথ্যটি আরো পিলে চমকানো। এই গিটারের বর্তমান মালিক মেটালিকার লিড গিটারিস্ট ক্রিক হ্যামেট। হ্যামেট ২০১৪ সালে এটি কিনে নেন ২ মিলিয়ন ডলারে।

১। ফেন্ডার ‘রিচ আউট টু এশিয়া’ স্ট্র্যাটোকাসটার (Fender “Reach Out To Asia” Stratocaster)

ফেন্ডারের এই গিটারের একক মালিকানা নেই। অন্যান্য অনেক গিটারের মতই এটিও বিক্রি হয়েছিল দাতব্য কাজের জন্য। ২০০৪ সালে ভারত মহাসমুদ্রে ঘটে যাওয়া সুনামি আক্রান্ত মানুষের সাহায্যে ফেন্ডারের এই গিটারটি বানানো হয়। এটি ছিল কানাডিয়ান কিংবদন্তী ব্রায়ান এডামসের ‘রিচ আউট টু এশিয়া’ প্রকল্পের একটি অংশ।
এই গিটারে সাক্ষর করেছেন বিশ্বের ১৯ জন নামি গিটারিস্ট। যার মাঝে অন্যতম ছিলেন ক্ল্যাপটন, জিমি পেইজ, রবার্ট গিলমোর ও টনি আইওমি। গিটারটি নিলামে বিক্রি হয়েছিল ২.৭ মিলিয়ন ডলারে।
সবার জন্য শুভকামনা। ভালো থকুন সুস্থ থাকুন। সঙ্গীতাঙ্গন এর পাশে থাকুন।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *