Press "Enter" to skip to content

যে ধর্ম রক্ষায় গঙ্গাস্নান, সেই ধর্মের কারণেই লালনের মৃত্যু…

– মোশারফ হোসেন।
বাউল সম্রাট লালন শাহ্‌। যাঁর আরেক নাম ফকীর লালন সাঁই। তবে শিষ্যরা ডাকে সাঁইজী নামে। আজ থেকে প্রায় ২৩৫ বছর আগের কথা। ১৭৭৪ সালে তিনি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তখন কুষ্টিয়া জেলা ছিল না। অবিভক্ত ভারতবর্ষেও নদীয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা ছিল। আর কুমারখালী ছিল ইউনিয়ন। লালন গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাড়ারা গ্রামের হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাবা ছিলেন শ্রী মাধব কর আর মা ছিলেন শ্রীমতি পদ্মাবতী। লালন বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান ছিলেন। শৈশবেই লালন তাঁর বাবাকে হারান। একমাত্র মায়ের আদর স্নেহে বেড়ে উঠেন তিনি। পরিবারের প্রধান বাবা বেঁচে না থাকায় সংসারের দায়-দায়িত্ব পড়ে লালনের কাঁধে। মা ছাড়া তখন তাঁর আর পৃথিবীতে কেউ ছিল না। মায়ের সেবার কথা ভেবে লালন বিয়ে করেন। লালন ব্যক্তি জীবনে ছিলেন নীতিবান। পরিবারের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের সাথে তাঁর বনিবনা না হওয়ায় মা ও স্ত্রীকে নিয়ে একই গ্রামের দাসপাড়ায় নতুন করে বসতি গড়েন। সংসার চালাতে গিয়ে লালনের আর লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। তবে তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন গান বাজনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ভাড়ারা গ্রামে কবিগান, পালাগান, কীর্তন সহ নানা রকম গানের আসর বসতো। লালন সেই আসরের একজন প্রিয়জন ছিলেন। তাঁর গান শুনে মানুষ মুগ্ধ হতো।

লালন পূন্যলাভের আশায় যৌবনের শুরুতে একদিন তাঁর ভাড়ারা গ্রামের দাসপাড়ার প্রতিবেশী বাউলদাস সহ অন্যান্য সঙ্গী-সাথী নিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে গঙ্গা স্নানে যান। সে সময় রাস্তা ঘাটের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। মাটির রাস্তা বর্ষায় কাদা আর গ্রীষ্মে ধুলো। তার উপর পায়ে হাঁটা ছাড়া কোন বাহন ছিলনা। মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে মানুষ তার গন্তব্যে যেত। তবে সমাজের হাতে গোনা কয়েকটি উঁচু পরিবারের জন্য ঘোড়া কিংবা গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। তাও সংখ্যায় খুবই কম। গঙ্গা স্নান সেরে লালন সঙ্গীদের নিয়ে বাড়ী ফেরার পথে আকস্মিকভাবে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। রোগের যন্ত্রনা ক্রমেই বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে লালন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই দেখে সঙ্গী-সাথীরা তাঁকে মৃত ভেবে মুখাগ্নি করে নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়। সঙ্গীরা বাড়ি ফিরে তাঁর মা ও স্ত্রীকে পথের মধ্যে লালনের করুন মৃত্যুর কথা জানায়। অসহায় মা ও স্ত্রী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অদৃষ্টের করুণ পরিহাস বলে তাদের এই মৃত্যুকে মেনে না নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। ধর্মমতে সমাজকে নিয়েই লালনের অন্ত্যষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এদিকে নদীর জলে ভাসতে ভাসতে লালনের দেহ পৌছায় পাড়ে। এক মহিলা কলস কাখে নদীতে জল আনতে গিয়ে দেখে একজন জীবন্ত মানুষ পানিতে ভাসছে। তাঁর চোখের পাতা পড়ছে, হাত-পা নড়ছে এই দেখে মহিলা তাঁকে নদী থেকে তুলে বাড়িতে নিয়ে যায়। মহিলা ছিলেন মুসলিম ধর্মের এক কারিকর পরিবারের রমনী। সেখানে সেবা শশ্রুষা পেয়ে লালন সুস্থ্য হয়ে ওঠেন। তবে বসন্ত রোগে লালনের এক চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখমন্ডলে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সুস্থ্য লালন নতুন জীবন ফিরে পেয়ে মনের আনন্দে ফেরেন তাঁর প্রিয় গ্রাম, প্রিয় মায়ের কাছে। সন্তানকে জীবিত দেখে তাঁর মা আনন্দে আত্মহারা। স্ত্রী তাঁর স্বামীকে ফিরে পেয়ে সৃষ্টিকর্তাকে জানায় কৃতজ্ঞতা। কিন্তু সকল আনন্দ কিছুক্ষণের মধ্যে হারিয়ে যায়। লালন জীবিত ফিরেছে শুনে গ্রামের লোক দলে দলে তাঁকে দেখতে আসে। সেই সাথে আসে সমাজপতিরা। তাঁরা সাফকথা জানিয়ে দেয় লালনের অন্তুষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এছাড়া সে মুসলমান বাড়ির জল খেয়েছে তাঁকে আর এই সমাজে থাকতে দেয়া হবে না। সেদিন ধর্মের অজুহাতে লালনকে সমাজ থেকে বিচ্যুত করা হয়। বিচ্যুত করা হয় মা ও স্ত্রীর কাছ থেকেও। দারুন কষ্ট আর মর্মবেদনা বুকে চেপে লালনকে চলে যেতে হয় বাড়ি ঘর সংসার মা স্ত্রী পরিবার পরিজন ছেড়ে। জন্মভূমির মায়া ছেড়ে যাওয়ার সময় তাঁর যে বেদনার সৃষ্টি হয়েছিল তা নাড়ি ছিড়ে যাওয়ার মতই। লালনের সাথে তাঁর স্ত্রী গৃহত্যাগী হতে চেয়েছিলেন কিন্তু সমাজের শাসন, লোকচক্ষুর ভয়, ধর্মের বেড়াজাল তার সে পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়। এই দু:খ যন্ত্রনা সইতে না পেরে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।
যে ধর্মের জন্য লালন গঙ্গা স্নানে গিয়েছিলেন, যে গঙ্গা স্নানে গিয়ে লালনের জীবন বিপন্ন হতে চলেছিল সেই ধর্মের অজুহাতে তাঁকে সমাজপতিরা সমাজ বিচ্যুত করে এই মর্মবেদনা লালনকে দারুনভাবে পীড়া দেয়।
সঙ্গীতাঙ্গনের সাথে থাকুন লালনের আরো অজানা কথা নিয়ে আবারো আসছে নতুন প্রতিবেদন। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন সুস্থ ধাকুন।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *